নিজস্ব প্রতিবেদক ।।
সুন্দরবন সুরক্ষা এবং প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ প্রতিরোধে বরিশালে বিভাগীয় পর্যায়ের এক পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২২ জুলাই) সকালে নগরীর বিডিএস ভবনে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রূপান্তরের উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মুজাহিদুল ইসলাম, বরিশাল অঞ্চলের প্রধান বন সংরক্ষক মোল্লা রেজাউল করিম, বিভাগীয় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আলাউদ্দিন এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাফিজ আশরাফুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার গুহ। এছাড়া হেলভেটাস বাংলাদেশের ম্যানেজার শাহরিয়ার মান্নান ও রূপান্তরের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর শুভাশিষ ভট্টাচার্য বক্তব্য দেন। এসময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিসিসির পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মো: ইউসুফ আলী, বরিশাল এনজিও ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সভাপতি আনোয়ার জাহিদ, ম্যাপের নির্বাহী পরিচালক শুভংকর চক্রবর্তী, শিক্ষাবিদ প্রফেসর শাহ সাজেদা, বেলার নির্বাহী পরিচালক লিংকন বাইন সহ বিভিন্ন পেশা ও শ্রেনীর নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বক্তারা বলেন বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম ও জীববৈচিত্র্য মানুষের তৈরি প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণের কারণে এখন চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। জোয়ারের পানি এবং পর্যটকদের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে বিপুল পরিমাণ অপচনশীল বর্জ্য। এর ফলে শুধু জলজ প্রাণীই নয়, বনের সামগ্রিক উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর জীবনচক্র মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য সুন্দরবনের জলজ পরিবেশের ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিচ্ছে। সুন্দরবনের ৫৪টি নদী ও খালে প্রতিদিন প্রায় ৫০ টন পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হচ্ছে। এর ফলে বনের অনন্য বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের সম্মুখীন এবং জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
আরও বলা হয়, পলিথিন ও প্লাস্টিক সূর্যের তাপে ও পানিতে গলে ক্ষুদ্র মাইক্রো প্লাস্টিক-এ পরিণত হয়। দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হওয়ায় শুশুক ও ডলফিন পানির পলিথিনকে জেলিফিশ মনে করে খেয়ে ফেলছে। ভেসে থাকা প্লাস্টিক ও পলিথিনে জড়িয়ে কচ্ছপসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে। মাছ, কাঁকড়া, ডলফিন ও কুমিরসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী এই বিষাক্ত কণা গ্রহণ করছে, যা পরবর্তীতে মানুষের খাদ্যচক্রেও প্রবেশ করছে।
প্লাস্টিকের ক্ষতিকর রাসায়নিক পানির লবণাক্ততার সাথে মিশে মাছের প্রজনন প্রক্রিয়া এবং বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের প্যাকেট ও জালের কারণে ডলফিন, কচ্ছপসহ অনেক জলজ প্রাণী শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বা আহত হয়ে মারা যাচ্ছে। প্লাস্টিক বর্জ্য সুন্দরীসহ অন্যান্য গাছের শ্বাসমূলে আটকে গিয়ে উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকাকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তর নদী ও খালের তলদেশে জমা হয়ে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত করছে।
বক্তারা আরও বলেন, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এখন প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণের কারণে মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে। বন বাঁচাতে এবং জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সুন্দরবন ভ্রমণে পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশ ও বন বিভাগ নিয়মিত অভিযান ও জরিমানা অব্যাহত রেখেছে, তবে সামগ্রিক সুরক্ষার জন্য উপকূলীয় এলাকায় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো অত্যন্ত জরুরি।
উন্মুক্ত আলোচনায় বক্তারা বলেন, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন উপকূলীয় বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় এবং কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও জীববৈচিত্র্যের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ এই বনাঞ্চলের মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সুন্দরবন রক্ষায় কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।