রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০৩:২৯ পূর্বাহ্ন
Logo

বরগুনায় বেড়েছে গরুর ক্ষুরা রোগ,ভ্যাকসিন সংকটে খামারিরা

/ ২১ বার পড়া হয়েছে
আপডেট : শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

বরগুনা প্রতিনিধি ।।

বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত গবাদিপশুর সংখ্যা। খামারিদের পালন করা প্রায় গরুই আক্রান্ত হচ্ছে এই রোগে।

তবে সরকারিভাবে এই মুহূর্তে বরগুনায় ভ্যাকসিন সরবরাহ না থাকায় এবং ওষুধ সংকটের কারণে আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা করাতে বিপাকে পড়ছেন বিভিন্ন এলাকার খামারি ও পশুপালকরা।

ফলে আক্রান্ত গরু মৃত্যুর শঙ্কাসহ বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন তারা। তবে জুলাই মাস থেকে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন জেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা।

বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের মনসাতলী নামক এলাকার বাসিন্দা মিলন চন্দ্র রায়। তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে গরু পালন করছেন। এ বছর তার পালন করা ৬টি গরুই ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত হয়েছে।

শুধু মিলন চন্দ্রই নয়, একই এলাকার নাসির নামে আরেক প্রতিবেশীরও ৫টি গরু আক্রান্ত হয়েছে একই রোগে। আক্রান্তের এক দিন পরই তার একটি ছোট গরুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া, ওই এলাকার আরও কয়েকজন বাসিন্দার গরু, ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলেও জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

হঠাৎ করে বরগুনায় গবাদিপশুর ক্ষুরা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও এই মুহূর্তে ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই জেলার প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে। ফলে স্থানীয় পদ্ধতি এবং চিকিৎসকের পরামর্শে বাইরের দোকান থেকেই ওষুধ কিনে আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা চালাচ্ছেন খামারি ও পশুপালকরা।

সরেজমিনে সদর উপজেলার ওই ইউনিয়নের বাসিন্দা মিলন চন্দ্র রায়ের বাড়িতে ঘুরে দেখা যায়, ঘরের সামনে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে তার ছয়টি গরু। প্রত্যকটি গরুই গত এক মাস ধরে ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত।

আর এ কারণেই গরুগুলোকে খাবার খাওয়ানোর জন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারছেন না তিনি। দীর্ঘ একমাস ধরে আক্রান্ত ওই গরুগুলোকে সুস্থ করতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন মিলন ও তার স্ত্রী। প্রতিদিন খাবার ও ওষুধ খাওয়ানোসহ গরুগুলোকে বিশেষভাবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হচ্ছে তাদের।

মিলন ও তার স্ত্রী শিপু রানীর অভিযোগ, প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে গরুর জন্য ভ্যাকসিন এবং কোনো ধরনের ওষুধই পাওয়া যায়নি। ফলে বাধ্য হয়ে বাইরের দোকান থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে তাদের। শুধু তারাই নয় এলাকার অন্য পশুপলকদেরও এ একই অভিযোগ।

এ ছাড়া, আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দ্রুত সময়ের মধ্যে জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানান তারা।

এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের মনসাতলী নামক এলাকার বাসিন্দা মিলন চন্দ্র রায় বলেন, আমি প্রায় ৪০ বছর ধরে গরু পালন করি। এ বছর প্রায় ১ মাস ধরে আমার গরুগুলো ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত হয়েছে।

শুধু আমার নয়, আশপাশের প্রায় সবার গরুই একই রোগে আক্রান্ত। পশু হাসপাতাল থেকে চিকিৎসার জন্য কোনো ওষুধ পাচ্ছি না। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে ওষুধ কিনে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে। গরুর পেছনে সময় দিতে গিয়ে এখন অন্য কোনো কাজও করতে পারছি না।

মিলন চন্দ্র রায়ের স্ত্রী শিপু রানী বলেন, গত একমাস ধরে ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত হয়ে আমাদের ছয়টি গুরু অসুস্থ। আমরা গরিব মানুষ, গরুর চিকিৎসা করাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু সরকারিভাবে কোনো ধরনের সহযোগিতা পাইনি। বাজার থেকে বেশি দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে আমাদের।

একই এলাকার বাসিন্দা মো. মাহমুদুল ইসলাম বলেন, এ বছর আমাদের এলাকার অসংখ্য গরু ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তবে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে বড় গরু মারা না গেলেও এলাকার বাসিন্দাদের ৩ থেকে ৪টি ছোট গরুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া, চিকিৎসকরা গ্রামে আসেন না। তাদের কাছে গেলে ওষুধ লিখে দেওয়া হয় তাও কিনতে হয় বাইরের দোকান থেকে। বর্তমান ক্ষুরা রোগের কোনো ভ্যাকসিনই পাওয়া যাচ্ছে না।

মো. নাসির নামে ওই এলাকার আরেক বাসিন্দা বলেন, প্রথমে আমার একটি গরু রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। এক দিন পরে আমার পাঁচটি গরু আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। আক্রান্ত হওয়ার এক দিনের মধ্যে ছোট একটি গরু মারা যায়। এরপর চিকিৎসক অন্য গরুগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ লিখে দিলেও সরবরাহ না থাকায় সরকারিভাবে গরুর জন্য কোনো ওষুধ পাইনি। সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনে চিকিৎসা করাতে হয়েছে।

বরগুনায় হঠাৎ করে ব্যাপকভাবে গবাদিপশুর ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ক্ষুরা রোগ সাধারণত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়।

মানুষের সংস্পর্শের মাধ্যমেও এ রোগ সুস্থ পশুর মধ্যে ছড়াতে পারে। কোরবানির সময় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পশু নিয়ে যাওয়া হয়। সাধারণত ওই সময়ের পরই ক্ষুরা রোগের বিস্তার ঘটে৷ আমাদের কাছে থাকা রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থায় বিভিন্ন এলাকায় এ রোগ দেখা দিয়েছে।

খামারিদের ভ্যাকসিনের পাশাপাশি আক্রান্ত পশুকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা এবং আক্রান্ত ওই পশুটিকে অন্য পশু থেকে আলাদা রাখার পরামর্শ দিচ্ছি। এ রোগে আক্রান্ত হলে বড় পশুর মৃত্যু হয় না। ছয় মাস থেকে এক বছর বয়সী কিছু পশুর মৃত্যু হতে পারে।

ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই এবং ওষুধ সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের এই মুহূর্তে কোনো ভ্যাকসিন মজুদ নেই। কোরবানির আগে ভ্যাকসিনের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহেই আমরা ভ্যাকসিন পাবো এবং পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু করা হবে।

এখন আমরা খামারিদের প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়ানোসহ বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিচ্ছি। তবে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com