Loading Now

ডিলার সিন্ডিকেটেই বাড়ছে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম

অনলাইন ডেক্স ।।

উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহারসহ নানান পদক্ষেপেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি সিলিন্ডারে ১৫ টাকা দাম কমিয়েছে মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি)। নতুন আদেশে খুচরা পর্যায়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্য এখন ১ হাজার ৩৪১ টাকা।

ভ্যাট কমিয়ে সরকার রাজস্ব হারালেও বাজারে এলপিজির দাম কমেনি। সরকারিভাবে ১২ কেজি গ্যাস সিলিন্ডার ১৩৪১ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা থাকলেও চট্টগ্রামে বাস্তবে আড়াই থেকে সাড়ে তিনশ টাকা বেশিতে গ্যাস কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। ঢাকাসহ দেশের অন্য জেলায় এই মূল্য আরও দুই-একশ টাকা কমবেশি। মূলত ডিলার সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে বাজারে খুচরা পর্যায়ে এলপিজির দাম বাড়ছে।

বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম মহানগরীর বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে ক্রেতা, খুচরা দোকানি ও ডিলারদের সঙ্গে কথা বলে এলপিজির বাজারের নৈরাজ্যের এ চিত্র পাওয়া যায়।

সংকটের সূত্রপাত
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ও পরিবহনে জড়িত এলপিজি ভেসেলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে আমেরিকান ট্রেজারি। এ নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে এলসি (ঋণপত্র) জটিলতার কারণে সম্প্রতি দেশের বাজারে এলপিজি সংকট তৈরি হয়েছে। আমদানি কমে যাওয়ায় সরবরাহ চেইনে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ সংকটের সুযোগে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি শুরু করেন ডিলার থেকে খুচরা বিক্রেতারা। গত ডিসেম্বরে এ সংকট প্রকট হয়। তখন চট্টগ্রামের বাজারেও ১২ কেজির এলপিজি ১৮শ থেকে দুই হাজার টাকায় কিনতে হয়েছে ভোক্তাদের। তবে ধীরে ধীরে সংকট লাঘব হতে শুরু করেছে। বড় বড় আমদানিকারকরা এলপিজি আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছেন। তবে সিন্ডিকেট কারসাজির কারণে বাজারে এলপিজির দাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

খুচরা পর্যায়ে প্রতি সিলিন্ডারে লাভ ১০০-১৫০ টাকা
চট্টগ্রাম নগরীর কাজীর দেউড়ি সিডিএ মার্কেটের তিন তলায় এলপিজি ব্যবসা করে খাজা গরীবে নেওয়াজ এন্টারপ্রাইজ। বুধবার দুপুরে গেলে দোকানটি বন্ধ পাওয়া যায়। দোকানে সাঁটানো কাগজের স্টিকারে দেওয়া মোবাইল নম্বরে ভোক্তা সেজে কথা হয় দোকানটির মালিক মো. কাইসারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে কমলা কালারের টোটাল গ্যাস আছে ১৭শ ৩০ টাকা এবং ২২ মুখের সিলিন্ডার ১৬শ ৭০ টাকা।’ পরে তিনি বলেন, ‘টোটালটি ১৭শ টাকায় দেওয়া যাবে। কম দাম দিলে কম দামি সিলিন্ডার দিতে হবে। ওগুলো (কম দামি) পানি বোতল (পানিমিশ্রিত)। কোনো দুর্ঘটনা হলে আমাদের দোষ দিতে পারবেন না।’

ওয়াসা এলাকার হাই লেভেল রোডের আল্লাহর দান সেনেটারিতে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১৬শ টাকা, ওই রোডের রংধনু ট্রেডার্সে একই গ্যাস ১৬শ ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে লালখান বাজার এলাকার চানমারি রোডের মাইন ট্রেডার্সে ১৬শ ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এলপিজি। ওই দোকানের মালিক মো. সোহেল বলেন, ‘আমরা একটি সিলিন্ডার বিক্রি করে ৫০-১০০ টাকা পাই। এগুলো ডিলারদের কাছ থেকে আনতে গাড়ি ভাড়া লাগে। আবার অনেক সময় ক্রেতার বাসায় পৌঁছে দিতে হয়। সবমিলিয়ে তেমন লাভ থাকে না।’

চানমারি রোডের ইকবাল ইলেকট্রনিক্সে বসুন্ধরা ও জেএমআইর গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ১৬শ টাকায়। একইভাবে নগরীর আসকার দিঘির পাড় এলাকার আকতার কুলিং কর্ণারে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে ১৬শ ৫০ টাকায়।
ব্যাটারি গলি এলাকার দোকানদার ফয়সাল বলেন, ‘এখন ডিলাররা সরকারি নির্দেশনা মানছেন না। ডিলারদের কাছ থেকে ১৫শ টাকা করে কিনে আমরা ১৬শ টাকায় বিক্রি করছি। আমরা যারা খুচরা বিক্রেতা তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাস্টমারের বাসায় ভর্তি সিলিন্ডার পৌঁছে দিই এবং খালি সিলিন্ডার নিয়ে আসি। এসব সিলিন্ডার বাসায় ডেলিভারি দিতে একজন কর্মচারী রাখতে হয়। আবার আমাদের সিলিন্ডারগুলো গাড়ি ভাড়া দিয়ে আনতে হয়। সবমিলিয়ে ১০০ টাকা বেশি নিয়েও মাস শেষে তেমন লাভ হয় না।’

লালখান বাজার এলাকার বাসিন্দা আবু ছৈয়দ বলেন, ‘জানুয়ারিতে ১৮শ টাকায়ও সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। মঙ্গলবার রাতেও একটি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে ১৬শ ৫০ টাকায়।’

মোমিন রোড এলাকার বাসিন্দা বাসু চৌধুরী বলেন, ‘সরকার এলপিজির দাম কমিয়েছে। পত্রিকায় ঘোষণা দিলেও দাম ৩-৪শ টাকা বেশি নিচ্ছে। প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

প্রতি সিলিন্ডারে ডিলাররা বেশি নিচ্ছেন ২০৪-২৫৪ টাকা
বিইআরসির ঘোষণা অনুযায়ী, বর্তমানে ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজি এলপিজির মূল্য ১৩৪১ টাকা। এরমধ্যে রিটেইলারের চার্জ আছে ৪৫ টাকা, রিটেইলার পর্যন্ত পরিবহন ভাড়াসহ ডিস্ট্রিবিউটরের চার্জ আছে ৫০ টাকা। তাকে ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ মূল্য হওয়ার কথা ১২৯৬ টাকা (রিটেইলারের চার্জ ৪৫ টাকা বাদ দিয়ে)। কিন্তু ডিলার ডিস্ট্রিবিউটররা ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি করছে ১৫০০-১৫৫০ টাকায়। এতে দাম বাড়ছে খুচরায়।

বুধবার বিকেলে সাগরিকা এলাকার আল মদিনা এন্টারপ্রাইজের পরিচালক রাসেল হোসেন বাবু বলেন, ‘১২ কেজি সিলিন্ডারের আজ ডিলারদের দাম ১৫শ টাকা।’ প্রতি সিলিন্ডারের দাম কেন ১৫শ টাকা নেওয়া হচ্ছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোম্পানি দাম বেশি নিচ্ছে। সিলিন্ডার নিয়ে গেলে গাড়ি অপারেটরদের প্ল্যান্টে বসে থাকে। একটি গাড়িকে দৈনিক আড়াই হাজার টাকা করে ডেমারেজ দিতে হয়। কারণ আমাদের খালি সিলিন্ডার প্ল্যান্টে পাঠাই। তখন প্ল্যান্টে সিলিন্ডারগুলো রিফিল করে নিয়ে আসে। একেকটি গাড়িকে দু-তিনদিনও অপেক্ষা করতে হয়।’

আল মদিনা এন্টারপ্রাইজ বেশ কয়েকটি অপারেটরের ডিলার হিসেবে কাজ করে। তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নগরীর বিভিন্ন খুচরা দোকানিকে এলপিজি সরবরাহ করে।

একইভাবে এলপিজির ডিলার হিসেবে দীর্ঘদিন করে ব্যবসা করছেন হালিশহরের মামিয়া এন্টারপ্রাইজ। খুচরা বিক্রেতা সেজে কথা হলে মামিয়া এন্টারপ্রাইজের বিক্রয় ম্যানেজার ইমরান হোসেন বলেন, ‘১২ কেজির প্রতি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম আজ ১৫শ ৫০ টাকা।’

যা বলছে ক্যাব
বিষয়টি নিয়ে ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বাজারের কোথাও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নেই। এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দেয় বিইআরসি। ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ১৫ টাকা কমিয়ে ১৩৪১ টাকা করা হয়েছে। কিন্তু বাজারে ১৬শ ৫০ থেকে ১৭শ টাকায় গ্যাস কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। দাম বেশি নিয়েও কেউ ভয়ে নেই। সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে বেশি দামে বিক্রি করছে। প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই।’

তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের প্রতি স্তরে স্তরে সিন্ডিকেটের কারসাজি চলছে। এলপিজিসহ বাজারে পণ্যের দাম কমাতে হলে সিন্ডিকেট কারসাজি কঠোর হাতে দমন করতে হবে। প্রশাসনকে দেখি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করতে। বৈঠক শেষ করে একই ব্যবসায়ী আবারও বেশি দামে পণ্য বিক্রি করছেন। কিন্তু প্রশাসন পরবর্তীসময়ে বিষয়টি ফলোআপ করছে না। অথচ ওপেন মার্কেটে এলপিজি বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি দরের চেয়ে ৩শ টাকার বেশি দিতে হচ্ছে ভোক্তাদের।’

উৎপাদক ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা কী বলছে
দেশের জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বুধবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘২০২৪ সালে যেখানে ১৬ লাখ টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন। এতে ২০২৫ সালে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার টন কম আমদানি হয়েছে। যে কারণে সারাদেশে গ্রাহক পর্যায়ে এলপিজির সংকট তৈরি হয়। মূলত দেশের বড় ৫-৬টি আমদানিকারক ২০২৫ সালে এলপিজি আমদানি কমিয়ে দিয়েছিল। আবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জ্বালানি পরিবহন নিয়ে আমেরিকান নিষেধাজ্ঞাজনিত কারণেও সংকট ত্বরান্বিত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘দেশে এলপিজি সংকট কাটাতে বিইআরসি বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। লোয়াব থেকে যত আমদানির অনুমতি চাওয়া হয়েছে, সেগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গত মাসে ৮ লাখ টন ক্যাপাসিটি বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়। ফলে চলতি ফেব্রুয়ারি মাসেই দেশে ১ লাখ ৯ হাজার টন আমদানি করা এলপিজি ঢুকেছে। ছোট ছোট ট্যাংকারে আমদানির কারণে অনেক সময় লাগছে। তারপরেও এখন অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান এলসি খুলেছে। আশা করা হচ্ছে মার্চে এলপিজির কোনো সংকট থাকবে না।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল সংকট মানসিকতার। এখনো বাজারে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। অথচ আগের চেয়ে সরবরাহ অনেক স্বাভাবিক।’

এলপিজি অপারেটর অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, ‘এখন এলপিজি যা আমদানি হচ্ছে, তাতে ভোক্তা পর্যায়ে সংকট থাকার কথা নয়। আমদানিকারকরা সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি বিক্রি করছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে খুচরা পর্যায়ে দাম বেশি রাখা হচ্ছে। এগুলো দেখার জন্য প্রশাসন আছে। তাছাড়া ইরান ইস্যুতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায়ও বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আমদানি শুরু হয়েছে। সামনে এলপিজির সরবরাহ আরও বাড়বে।’

তথ্য সূত্র : জাগো নিউজ,,,,,,,

Post Comment

YOU MAY HAVE MISSED