বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ০২:০৩ অপরাহ্ন
Logo

সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম মাওলানা শরফ উদ্দিন বেগের ইন্তেকাল

/ ২৮ বার পড়া হয়েছে
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬

চলে গেলেন অবিভক্ত বাংলার আলেম সমাজের অন্যতম প্রবীণ ব্যক্তিত্ব, বরিশাল স্টিমারঘাট জামে মসজিদের সম্মানিত খতিব ও আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা আলহাজ মির্জা শরফউদ্দিন বেগ। ৯৮ বছর বয়সে বুধবার (১ জুলাই) সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
তাঁর ইন্তেকালের খবরে বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শোকের ছায়া নেমে আসে। দীর্ঘ ৬৫ বছর খুতবা, ইমামতি ও ইসলামের দাওয়াতের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া এই প্রবীণ আলেমকে শেষ বিদায় জানাতে বুধবার বাদ জোহর বরিশালের হেমায়েত উদ্দিন ঈদগাহ ময়দানে হাজারো মুসল্লির ঢল নামে। জানাজার সময় আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। হালকা ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টির পর সূর্যের ক্ষণিক উঁকি যেন আবেগঘন পরিবেশকে আরও গভীর করে তোলে।
মরহুমের ছোট ছেলে মাওলানা শিহাব উদ্দিন বেগ জানাজার নামাজে ইমামতি করেন। পরে তাঁকে বরিশাল মুসলিম কবরস্থানে দাফন করা হয়।
জানাজায় বরিশালের বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, আলেম-ওলামা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মানুষ অংশ নেন।
বরিশাল জেলা ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা আব্দুল মান্নান বলেন, “মাওলানা মির্জা শরফউদ্দিন বেগ ছিলেন বরিশাল নগরীর প্রায় সাড়ে তিনশ মসজিদের ইমামদের ইমাম। শুধু বরিশাল নয়, বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইমাম তাঁর ছাত্র ছিলেন। তাঁর ইন্তেকালে দেশের আলেম সমাজ একজন অভিভাবককে হারাল।”
জামে এবায়দুল্লাহ মসজিদের ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান বেগ বলেন, “তিনি আমার চাচা হলেও আগে ছিলেন আমার শিক্ষক। আমার জানামতে, তিনি কখনো এক ওয়াক্ত নামাজও কাজা করেননি। শেষ বয়সেও তিনি মানুষকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ার আহ্বান জানিয়ে গেছেন।”
মাওলানা মির্জা শরফউদ্দিন বেগ ১৯২৮ সালে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরাদি ইউনিয়নের বলাইকাঠি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  দেশভাগের আগে অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ প্রচারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে তার শিক্ষা জীবন শুরু হয়েছিল বরিশালের মাহমুদিয়া মাদ্রাসা থেকে। এরপর তিনি শাহারানপুর মাদ্রাসা, ভারতের উত্তরপ্রদেশ এ পড়াশুনা করেন। এখানে তাঁর শিক্ষক ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মোহাদ্দেস জাকারিয়া (রহঃ)। তিনি হোসাইন আহমদ মাদানী (রহঃ) এর খলিফা ছিলেন।  এছাড়াও সরকারি বেসরকারিভাবে বহুবার বহু রাষ্ট্রে সফর করেন তিনি। ১৯৬০ সাল থেকে তিনি স্টিমারঘাট জামে মসজিদে ইমামতি শুরু করেন। নিজের দীর্ঘ জীবনে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন দেশভাগ, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের নানা রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবর্তন।
ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য, মুসলিম সমাজের নৈতিক ও ধর্মীয় অবক্ষয় তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি মানুষকে পবিত্র কুরআন ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানিয়ে গেছেন। মৃত্যুর মাত্র তিনমাস আগেও জুমার বয়ানে তিনি মুসল্লিদের কুরআনের শিক্ষা, সুন্নাহর অনুসরণ এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি অবিচল থাকার তাগিদ দিয়েছিলেন
প্রায় ৬৫ বছর বরিশাল স্টিমারঘাট জামে মসজিদের খতিব ও ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাওলানা শরফউদ্দিন বেগ। তাঁর দীর্ঘ ইমামতি জীবনে অসংখ্য আলেম, হাফেজ, ইমাম ও দ্বীনি শিক্ষার্থী তাঁর সান্নিধ্যে গড়ে উঠেছেন। ইসলামী জ্ঞানচর্চা, সাদাসিধে জীবনযাপন, বিনয় এবং নৈতিক দৃঢ়তার জন্য তিনি ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে ছিলেন শ্রদ্ধা, আস্থা ও অনুকরণের প্রতীক।
মরহুমের বাবা মাওলানা মির্জা নাজির আহম্মদ বেগও ছিলেন একজন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ। তাঁর দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে মরহুম শামসুদ্দিন বেগ এবং ছোট ছেলে মরহুম মাওলানা মির্জা শরফউদ্দিন বেগ। মৃত্যুকালে তিনি মেয়ে ও দুই ছেলে রেখে গেছেন। বড় ছেলে মাওলানা মহিউদ্দিন বাচ্চু ঢাকার একটি মসজিদের ইমাম এবং ছোট ছেলে মাওলানা মির্জা শিহাব উদ্দিন মাসুম বর্তমানে বরিশাল স্টিমারঘাট জামে মসজিদে ইমামতি করছেন।
তাঁর মৃত্যুতে বরিশালের বিশিষ্ট আলেম-ওলামা, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ পৃথক শোকবার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।
পবিত্র কুরআনের শিক্ষা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দু করে টানা ছয় দশকেরও বেশি সময় মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান জানিয়েছেন মাওলানা মির্জা শরফউদ্দিন বেগ। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত জুমার সেই চিরচেনা আহ্বান -“তোমরা মানুষ হও। কুরআনকে আঁকড়ে ধরো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের কোনো বিকল্প নেই।” আজ আর স্টিমারঘাট জামে মসজিদের মিম্বার থেকে শোনা যাবে না। কিন্তু তাঁর শিক্ষা, আদর্শ, অসংখ্য ছাত্র এবং দীর্ঘ ৬৫ বছরের ইমামতির উত্তরাধিকার তাঁকে বরিশালের ধর্মীয় ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com