বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ০৩:৫৮ অপরাহ্ন
Logo

চরকাউয়ার স্বনির্ভর খাল খনন এখন কৃষকের গলার কাঁটা

/ ৪৮৬ বার পড়া হয়েছে
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

 

স্টাফ রিপোর্টার:
প্রায় ২৫ বছর ধরে কৃষি উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হওয়ার পর বরিশাল সদর উপজেলার চরকাউয়া ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ভরাট হয়ে যাওয়া খালগুলো এ বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের জানুয়ারী থেকে পূনঃ খনন কাজ শুরু করে তৎকালীন অন্তর্বতি সরকার।  বিএডিসি কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পটি  বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায়  এনে স্বনির্ভর খাল খনন কর্মসূচী যার মধ্যে রয়েছে ১টি কালভার্ট ও ৪ কিলোমিটার খাল পূনঃ খনন। প্রকল্পের ১ম পর্যায়ের কাজ প্রায় সমাপ্ত হওয়ার পথে।
স্থানীয় ভুমি মালিক শহিদুল ইসলাম বলেন, কোটি টাকার খাল কাটা হয়েছে কিন্তু কোন উপকার হয়নি আমাদের। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। আগের চেয়ে এখন আরো ভয়াবহ অবস্থা।খননে  আমাদের মতামত নেয়া হয়নি। আমাদের রেকর্ডীয় জমি কেটে খাল কাটা হয়েছে। আমরা ক্ষতিপুরনের জন্য মামলা দায়ের করবো। তিনি বলেন, একটি পরিবারের একটি ঘেরের জন্য খাল খননের টাকা দিয়ে ১২ ফিট রাস্তা করা হয়েছে। এটা অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতি। খাল খননে ব্যক্তি লাভবান হলেও আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। এ বিষয়ে স্থানীয় সাংসদ মজিবুর    রহমান সরোয়ারকে অবহিত করেছি। খাল খননে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে এর দৃষ্টান্ত মুলক বিচার চাই। শিঘ্রই বিএডিসি ও জেলা প্রশাসক বরাবরে আবেদন করবো এ অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে।
খাল খননে কৃষকদের কোন উপকার হয়নি, উল্টো লস হয়েছে জানিয়ে স্থানীয়  কৃষক কাওছার হোসেন বলেন, সরকার যে উদ্দ্যেশে খাল খনন কর্মসূচী হাতে নিয়েছে তার সুফল থেকে আমরা কৃষকরা বঞ্চিত। এবার ইরি ধানে পানি দিতে পারি নাই। কষ্ট করে ইরি চাষ করেছি। পানি থাকায় ধান কাটতে কস্ট হয়েছে। খাল কেটে দুপাশে রাস্তা করেছে কিন্তু পানি আসা যাওয়ার জন্য নালা বা কালভার্ট নির্মান করেনি। এক কথায় এখানে খাল কাটা কর্মসূচী বিফলে গেছে। জমিতে পানি উঠেছে, নামার ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। চরকাউয়ার বিশ্বাষ বাড়ি থেকে হালিম মাস্টার বাড়ি পর্যন্ত খালের দু পাড়ে গাছ কাটানো হয়েছে অথচ এখন পর্যন্ত খালই কাটার কোন পরিকল্পনা নাই। তিনি বলেন, ক্ষমতার প্রভাবে জোড় করে খালের বাইরেও মালিকানা জমি কাটা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, খালের ভিতর বাঁধ আছে সেগুলো কিন্তু এখনো কাটা হয়নি। খালগুলো এখন আমাদের গলার কাটায় পরিনত হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, পূর্ব কোলায় প্রায় ৩’শ একর জমিতে ড্রেন না করায় পানি নেওয়া যাচ্ছেনা। উল্টো সেখানের পানি আটকে যাওয়ায় বর্তমান মৌসুমে জমিগুলো অনাবাদি থাকছে। তাছাড়া খাল কাটার প্রথম পর্যায়ে অপরিকল্পিতভাবে গ্রামবাসীর গাছপালা নির্বিচারে কাটা হয়েছে। কারিগরি নজরদারী না থাকায় ভেকু দিয়ে খাল কাটায় দুপাশে ইটের রাস্তা ভেঙ্গে পড়েছে। এদিকে পশ্চিম কোলায় প্রায় ৪’শ একর জমিতে পানি আটকে আছে। ফলে এই জমিগুলোও এবারের মৌসুমে অনবাদি রয়েছে। উল্লেখ্য, ঠিকাদারের প্রতিনিধি হিসাবে প্রকল্পের কাজ করেছেন খালেদ সাইফুল্লাহ নামে একজন স্থানীয় ব্যক্তি। স্থানীয়দের বক্তব্য উক্ত ব্যক্তি সকল কাজ একক সিদ্ধান্তে করেছেন।তিনি কখনো নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা জিয়া হায়দারের আত্বীয়,কখনো সিটি প্রশাসক শিরীন, কখনো মহানগর বিএনপির সভাপতি মনিরুজ্জামান ফারুকের ঘনিষ্ঠ আবার কখনো নিজেকে এমপি সরোয়ার মিয়ার পিএস দাবি করে প্রভাব বিস্তার করেন। আসলে তিনি একজন জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় কর্মী। এমনকি কাজও করেন জামায়াতের মালিকানাধীন একটি  প্রতিষ্ঠানে। এই প্রভাব বিস্তার করে  কারও কোনো আপত্তি শোনেননি।প্রায়শই বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের তিনি এখানে নিয়ে এসে ফটোসেশান করেন।মাঝে মাঝে সাংবাদিকদের ও নিয়ে যান।বিএনপির নেতাদের ভয়ে কেউ মুখ খোলে না বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রকল্পের প্রথম উদ্যোক্তা মতিউল ইসলাম রানা বলেন, প্রকল্পের অব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াগত ত্রুটির জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মেসার্স রাজা এন্টারপ্রাইজ প্রত্যক্ষ দায়ী। কেননা, তার উচিত ছিল প্রকল্প এলকায় থেকে মাঝে মাঝে সার্বিকভাবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া মনিটরিং করা। এছাড়া বিএডিসি প্রকল্প প্রণয়নে স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য যাচাই কিভাবে চূড়ান্ত করেছিলেন, ঠিকাদারের সাথে চুক্তির শর্তে কি আছে এ বিষয় গুলো খতিয়ে দেখা দরকার। তিনি আরও বলেন, সংগঠিত ভূল ত্রুটির জন্য ঠিকাদার এবং বিএডিসি উভয় প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা আছে।
খাল খনন প্রকল্পের ঠিকাদার রাজা এন্টারপ্রাইজের মালিক খলিলুর রহমান বলেন, আমি ওখানের ঠিকাদার হলেও আমি সাব-কন্ট্রাক্টে খালিদ সাইফুল্লাহকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে কন্ট্রাক্ট দিয়েছি। উনি ওনার মত করেছে। আমি খাল কাটার ঠিকাদার। খালের ভিতর বাঁধের ব্যাপারে বলেন, আমি কিছুই জানিনা ওটা সাব কন্ট্রাক্টার সাহেব বলতে পারবেন। আমি কল করে ওনাকে (সাব কন্ট্রাক্টার) বলে দিবো বাঁধ কেটে দিতে। খালের মাটি দিয়ে সাধারন মানুষের ফসলি জমি নস্ট করে ১২ ফিট রাস্তা নির্মানের ব্যাপারে তিনি বলেন, এটা সাব কন্ট্রাক্টার খালিদ সাইফুল্লাহ করেছে তাদের ব্যক্তিগত ঘেরে যাওয়ার জন্য।
আরেক ঠিকাদার আতিকুর রহমান বলেন,আমি ঠিকাদার কিন্তু সব নিয়ন্ত্রন করেন স্থানীয় খালিদ সাইফুল্লাহ নামে এক ব্যক্তি।তিনি একজন প্রভাবশালী ঝালকাঠির এক প্রতিমন্ত্রীকে ফোনে ধরিয়ে দিয়ে  নিজের মত করে খাল কাটা, রাস্তা নির্মাণ ও একটি ব্রিজ করেছেন। আমি ঠিকাদার হলেও তিনিই (খালেদ) সব কিছু করেন। আমাকে কিছু বলেনা।

এ ব্যাপারে বিএডিসির সহকারি প্রকৌশলী আতাউর রাব্বী বলেন, প্রতি কিলোমিটারে পাইপ স্থাপন করে পানি নিষ্কাসনের ব্যবস্থা গ্রহন করবো। খাল খননে অনিয়ম, ইটের সড়ক ভেঙ্গে খালে পড়ে যাওয়া, অপরিকল্পিত খাল খনন, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি, খালের মাটি দিয়ে ১২ ফিট সড়ক নির্মানের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে অফিসে চায়ের আমন্ত্রন জানান।
এ ব্যাপারে বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ ওয়াহিদ মুরাদ বলেন, শিঘ্রই পরিদর্শনে যাবো। ত্রুটি থাকলে তা সমাধান করবো।

এ বিষয়ে খালেদ সাইফুল্লাহ এর সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তার ব্যবহৃত মুঠোফোন ০১৭১১২৬১…নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও নাম্বার বিজি পাওয়ায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

তবে সচেতন মহলের দাবী, খাল খনন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি সাহসী পদক্ষেপ। সেই প্রকল্পে নয়ছয় সঠিকভাবে তদন্ত করে যদি অনিয়ম পাওয়া যায় তাহলে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া এবং যারা এই ব্যক্তির মদদদাতা তাদেরকেও সাংগঠনিকভাবে শাস্তির আওতায় আনার দাবী করা হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান সরোয়ারের মুঠোফোন এ কল দেয়া হলে তিনি জানান,খাল খননে কিছু অনিয়মের কথা তিনি লোকমুখে শুনেছেন।বর্তমানে তিনি ঢাকায় সংসদ অধিবেশনের কাজে রয়েছেন।বরিশালে এসে বিষয়টি দেখবেন বলে জানান।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com