রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০১:৩৩ অপরাহ্ন
Logo

১৮ লাখ টন বোরো চাল এখন কৃষকদের ঘরে

/ ৭৫ বার পড়া হয়েছে
আপডেট : রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥

অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টি সহ ডিজেলের কৃত্রিম সংকটের পর মূল্যবৃদ্ধির মত লাগাতার প্রতিকূলতা জয় করে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ১৮.৩৪ লাখ টন বোরো চাল ঘরে তুলেছেন বরিশালের কৃষকরা। যা এযাবতকালের এক অনন্য নজির বলে মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষিবীদরা। তবে ধানের দরপতনে কৃষকের কপালে দুশ্চিন্তার ভাজ ক্রমশ গভীর হচ্ছে। বৃষ্টির অভাবের সাথে অত্যাধিক তাপ প্রবাহে অতিরিক্ত সেচ প্রদানের সাথে ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধিতে এবার বরিশালে প্রতিমণ বোরো ধানের উৎপাদন ব্যায় সাড়ে ১২শ টাকার ওপরে উঠে গেলেও ধানের দর ১১শ টাকার মধ্যে। ফলে কৃষকের স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই।
সদ্য সমাপ্ত রবি মৌসুমটি ছিল বরিশাল কৃষি অঞ্চলের জন্য যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ ও সমস্যা সংকুল। একদিকে বৃষ্টির অভাব, অপরদিকে ডিজেলের কৃত্রিম সংকটের পরে মূল্যবৃদ্ধি, পুরো মৌসুমজুড়ে কৃষকদের চরম বেকায়দায় ফেলে। এমনকি মাঠে মাঠে বোরো ধান যখন থোর ও ফুল পর্যায়ে, তখন থেকেই ডিজেলের সংকট শুরু হয়। লাগাতার বৃষ্টির অভাব পরিস্থিতিকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
গতবছর ১ নভেম্বরের টানা ১২৭ দিন পরে গত ৯ মার্চ বরিশালে প্রথম বৃষ্টির দেখা মিললেও পুরো মাসজুড়েই বৃষ্টিপাতের ঘাটতি ছিল ৪৯% । কিন্তু এপ্রিলে যখন মাঠজুড়ে বোরো ধানের সমারোহ তখনই অতিবৃষ্টি নতুন ঝুঁকি তৈরী করে। এপ্রিল মাসে বরিশালে বৃষ্টিপাত ছিল স্বাভাবিকের ১৬৯% বেশি। আবার সদ্য বিদায়ী মে মাসেও বৃষ্টিপাতের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে স্বাভাবিকের ৪৫.৩%।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-ডিএই’র মতে, গত এপ্রিলের মধ্যভাগের প্রবল বর্ষণে বরিশাল কৃষি অঞ্চলের ৭৫,৬১১ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির তলায় চলে যাওয়ায় ৫শ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে প্রায় আড়াইহাজার টন বোরো চালের উৎপাদন ক্ষতি হলেও সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত গত সপ্তাহেই দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৩.৯০ লাখ হেক্টরের বোরো ধানের কর্তন সম্পন্ন করে কৃষকের ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে। এবার বোরো ধানের গড় ফলন ছিল হেক্টরে ৪.৭০ টন।

ফলে সদ্য সমাপ্ত রবি মৌসুমে বরিশাল কৃষি অঞ্চলে ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ৮৭৩ টন বোরো চাল কৃষকের গোলায় উঠেছে। বিগত খরিপ-২ মৌসুমেও লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে বরিশালের কৃষিযোদ্ধারা প্রায় ২৪ লাখ টন আমন চাল উৎপাদনে সক্ষম হয়েছিলেন।
প্রায় ১৪ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত বরিশাল কৃষি অঞ্চলে এখনো কৃষিসেচ ব্যবস্থার ৯০ ভাগই ডিজেলনির্ভর হওয়ায় ধানের উৎপাদন ব্যায়ও দেশের যেকোন স্থানের তুলনায় অন্তত ৩০ ভাগ বেশি। সদ্য সমাপ্ত রবি মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলে কৃষিসেচ কাজে যে প্রায় দেড় লক্ষাধিক সেচযন্ত্র ব্যবহার হয়, তার অন্তত ১.৩০ লাখই ছিল ডিজেলনির্ভর। অথচ বিদ্যুতায়িত সেচাবাদে পানি উত্তোলন ব্যায় যেমন কম, তেমনি সেচকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ব্যায়ের ২০ ভাগ সরকার সরাসরি ভর্তুকি দিয়ে থাকে। কিন্তু ডিজেল ব্যবহারে কোন ভর্তুকি নেই। এমনকি ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ডিজেলে সেচাবাদে প্রতি শতাংশে ২শ টাকা করে নগদ ভর্তুকি দেয়ার পরে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। পরবর্তি সরকার আর সে পথে পা বাড়ায়নি।
মাঠ পর্যায়ের কৃষিবীদদের মতে, বরিশাল অঞ্চলে কৃষিকাজে ব্যবহ্রত সেচযন্ত্র অবিলম্বে বিদ্যুতায়িত করার পাশাপাশি সোলার পদ্ধতিতে নজর দেয়ার সময় এসেছে। সদ্য সমাপ্ত রবি মৌসুমে বরিশালে ৪০টি সোলার পাম্পের সাহায্যে প্রায় ১ হাজার হেক্টরে সেচ প্রদান সম্ভব হয়েছে।

অপরদিকে বরিশাল অঞ্চলে এখনো হাইব্রীড বোরো ধানের আবাদ কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছতে পারেনি। এমনকি এখনো স্থানীয় সনাতন জাতের বোরো ধানের আবাদ হচ্ছে। যার উৎপাদন হেক্টর প্রতি ১-১.৫ টনের বেশি নয়। অথচ হাইব্রীড ধানের উৎপাদন হেক্টর প্রতি ৫টনের ওপরে। এছাড়া উচ্চ ফলনশীল-উফশী ধানের উৎপাদনও সাড়ে ৪ টনের বেশি।
মাঠ পর্যায়ে কৃষিবীদদের মতে, সদ্য সমাপ্ত রবি মৌসুমে বরিশাল কৃষি অঞ্চলে বোরো ধানের গড় ফলন ছিল ৪.৭০ টন। অথচ ধান গবেষনা ইনস্টিটিউট-ব্রি উদ্ভাবিত হাইব্রীড ও উফশী জাতের ধানের আবাদ নিশ্চিত করতে পারলে আগামী ৫ বছরের মধ্যেই এ অঞ্চলে বোরো ধানের গড় ফলন ৫ টনে উন্নীত করা সম্ভব। যাতে করে অনায়াশেই ২৫ লাখ টন বোরো চাল ঘরে উঠবে বলেও আশাবাদী কৃষিবীদরা।
অপরদিকে বরিশাল অঞ্চলে রবি মৌসুমে লক্ষাধিক হেক্টর কৃষিজমি অনাবাদি থাকছে। এসব জমি আবাদের আওতায় আনা সম্ভব হলেও এ অঞ্চলে আরো অন্তত ৫ লাখ টন চাল বা গম উৎপাদন সম্ভব বলে মাঠ পর্যায়ের কৃষিবীদদের দাবী।

এ ব্যাপারে বরিশাল কৃষি অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী ও অতিরিক্ত পরিচালক ড. নজরুল ইসলাম সিকদার বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি সেক্টরে নিরব বিপ্লব ঘটছে। প্রকৃতিনির্ভর হলেও কৃষির হাত ধরেই এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। আগামীতে পতিত জমি আবাদের আওতায় আনা সহ হাইব্রিড ও উফশি জাতের ধানের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ চলছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com