অনলাইন ডেক্স ।।
মে মাসে দেশে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার চিত্র আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। এ মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩২৬ জন নারী ও শিশু, যার মধ্যে ৭৮ জন ধর্ষণ, ১৬ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং ৬ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন। মে মাসে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে নারী-শিশু ধর্ষণ-হত্যা
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বিষয়ক মাসিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। সংস্থাটির বিশ্লেষণ বলছে, এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে সহিংসতার ঘটনা যেমন বেড়েছে, তেমনি এসব অপরাধের প্রকৃতিও আরও ভয়াবহ ও নৃশংস হয়ে উঠেছে।
অর্থাৎ এ সময়ে ধর্ষণের পরিমাণ ৪০ শতাংশের কাছাকাছি বৃদ্ধি পেয়েছে। আর ধর্ষণ ও হত্যা বেড়েছে তিনগুণ। সেই সঙ্গে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টাও ধারাবাহিক বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রোববার (৩১ মে) দুপুরে এমএসএফের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের সই করা মাসিক প্রতিবেদনটি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মে মাসে ধষর্ণের চেষ্টার শিকার ২৮ জন, এসিড সহিংসতার ৩ জন , যৌন হয়রানির শিকার ১৮, শারীরিক নির্যাতন ৪৩, আত্মহত্যা ৩০, অপহরণ ও নিখোঁজ ১২ ও হত্যার শিকার হয়েছেন ৭৯ জন নারী। বেআইনি সালিশের শিকার ৬ জন ও নবজাতক উদ্ধার ৭ জন।
এমএসএফ বলছে, চলতি মাসে দেশে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার সব ধরনের ঘটনা গত মাসের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনা চলতি বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় এ মাসে সবচেয়ে বেশি এবং এ সহিংসতার শিকার সকলেই শিশু।
প্রতিবেদনে শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। বলা হয়, শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন সংগঠনের বিচার দাবির প্রেক্ষিতে রাষ্ট্র কর্তৃক অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেফতার এবং বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করা প্রশংসনীয়।
তবে এমএসএফ মনে করে, নারী ও শিশুর প্রতি সংঘটিত প্রতিটি সহিংসতাকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যথায়, শুধুমাত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত ঘটনাগুলোতেই রাষ্ট্রের সক্রিয়তা দেখা গেলে বহু ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে ২ জন কিশোরী ধর্ষণ, ২টি শিশু ধর্ষণ চেষ্টা, ১ জন কিশোরী ধর্ষণ চেষ্টা, ও ১ জন কিশোরীকে পাশবিক নির্যাতনসহ মোট ৬টি ঘটনায় সমাজপতিরা আপোষ করেছেন।
সংস্থাটি বলছে, এটি প্রচলিত আইনকে অবজ্ঞা করে বেআইনিভাবে সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করা হয়েছে। এ সকল ঘটনায় ধর্ষণের মামলা হলেও সালিশকারীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কোনো আলাদা মামলা হয় না। যদিও কোনো ঘটনায় মামলা হয়, তাও সেটা ধর্ষণের সহযোগী হিসেবে, সালিশ করার অপরাধে নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সালিশকারীরা আইনের আওতায় তো আসেই না বা কোনো শাস্তিও ভোগ করে না।
মে মাসে ৫ মৃত ও ২ জীবিতসহ মোট ৭ নবজাতক শিশুকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট থানা থেকে জানা যায়- অধিকাংশ ক্ষেত্রে নবজাতক শিশুকে পরিত্যাগের ঘটনায় প্রকৃত অভিভাবক বা দায়ীদের শনাক্তে কার্যকর অনুসন্ধান পরিচালিত হয় না এবং কাউকে আইনের আওতায় আনার ঘটনাও খুবই বিরল।
পুলিশ মৃত নবজাতকের ক্ষেত্রে সাধারণত অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা (ইউডি) রুজু করে থাকে এবং জীবিত নবজাতক উদ্ধার হলে তাকে সমাজসেবা অধিদফতর বা সংশ্লিষ্ট শিশু সুরক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এমএসএফ মনে করে, এ ধরনের ঘটনা চরম অমানবিক, নিন্দনীয় এবং শিশু অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে ব্যর্থতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। ফলে সমাজে অমানবিকতা, অনাচার ও দায়মুক্তির একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত তৈরি হচ্ছে।