স্পোর্টস ডেক্স ।।
বিশ্বকাপ অভিষেকেই সামনে পড়েছে জার্মানির মতো প্রতিপক্ষ। ১ লাখ ৬০ হাজার জনসংখ্যার কুরাসাও যে গোলবন্যায় ভেসে যাবে, মোটামুটি অনুমিতই ছিল। হলোও তাই, ৭–১ গোলের হারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল তাদের। কিন্তু সেই কুরাসাও এভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, তা কে-ই বা কল্পনা করেছিল! কানসাস সিটিতে আজ ইকুয়েডরকে গোলশূন্য ড্রয়ে রুখে দিয়ে ইতিহাস গড়েছে তারা। সেই ইতিহাসের নায়ক ১৫টি সেভ দেওয়া এলয় রুম।
অথচ নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া ৩৭ বছর বয়সী এই গোলরক্ষকের কুরাসাওয়ের হয়ে খেলার গল্পটা শুরু হয়েছিল এক নাটকীয় ফোন কলে। ২০১৪-১৫ মৌসুমের কথা, কুরাসাওয়ের তখনকার প্রধান কোচ এবং ডাচ কিংবদন্তি প্যাট্রিক ক্লুইভার্ট আচমকাই কল দেন রুমকে। আমন্ত্রণ জানান ‘ব্লু ওয়েভ’ খ্যাত দলটির গোলপোস্ট সামলানোর। ক্লুইভার্টের সেই এক ফোনকলেই বদলে যায় কুরাসাও ফুটবলের গতিপথ।
রুমের পথ ধরে পরবর্তীতে নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া আরও অনেক ডাচ ফুটবলার কুরাসাওয়ের হয়ে খেলতে আসেন। চলমান বিশ্বকাপের ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে ২৫ জনই ডাচ বংশোদ্ভূত, যার সূত্রপাত হয়েছিল রুমের হাত ধরেই।
তীক্ষ্ণ রিফ্লেক্সের জন্য পরিচিত এই গোলরক্ষকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নানান স্মরণীয় মুহূর্তে ভরপুর। শুধু তো আর তাঁকে কিংবদন্তি বলা হয় না। তাঁর ইনস্টাগ্রামে পিন করা ছবিগুলোর একটি লিওনেল মেসির সঙ্গে। কুরাসাওয়ের বিপক্ষেই হ্যাটট্রিক করে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১০০ গোলের মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন মেসি। তিন বছর আগে সেদিন কুরাসাওয়ের গোলবারের নিচে ছিলেন রুমই। সাধারণত যেখানে ফুটবলাররা মেসির জার্সির পেছনে ছোটেন, সেখানে ম্যাচ শেষে মেসি নিজেই এগিয়ে আসেন রুমের দিকে এবং জার্সি বদলের ইশারা করেন। নিজের শততম গোলের স্মৃতি ধরে রাখার পাশাপাশি ম্যাচজুড়ে রুমের দুর্দান্ত কয়েকটি সেভের প্রশংসাও করেছিলেন মেসি।
সেই প্রশংসার সার্থকতা রুম আবারও প্রমাণ করলেন ইকুয়েডরের বিপক্ষে বিশ্বমঞ্চে। ২৯টি শটের মধ্যে ১৫টিই ছিল লক্ষ্য বরাবর, যার প্রতিটিই রুখে দিয়েছেন রুম। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের বিশ্বকাপ ম্যাচে এর আগে এত বেশি সেভের রেকর্ড নেই আর কারও। ১২ বছর আগে ২০১৪ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের টিম হাওয়ার্ড ১৬টি সেভ করেছিলেন বটে, তবে সেই ম্যাচ গড়িয়েছিল অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে। তা ছাড়া পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করা ‘অপ্টা’র মতে, হাওয়ার্ডের প্রকৃত সেভ সংখ্যা ছিল ১৫। ফলে অতিরিক্ত সময় ছাড়াই এক অনন্য বিশ্বরেকর্ড গড়লেন মায়ামি এফসির এই গোলরক্ষক।
বিশ্বকাপে নাম লেখানোর আগ পর্যন্ত কুরাসাও পরিচিত ছিল কেবল কেনলি জানসেন ও অ্যান্ড্রু জোন্সের মতো বেসবল তারকাদের দেশ হিসেবে। বেসবলের সেই দ্বীপে এবার ফুটবলের জয়গান। ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমের দৃশ্যটাও ছিল রাজকীয়। হিউস্টনে নেদারল্যান্ডসের ম্যাচ দেখে সোজা কানসাস সিটিতে উড়ে এসেছিলেন ডাচ রাজা উইলেম-আলেক্সান্ডার এবং রানি ম্যাক্সিমা। ড্রেসিংরুমে রাজদম্পতির নাচে-গানে উদ্যাপনের পর রুম রসিকতা করে বলেন, ‘কুরাসাওতে এবার আমার একটা ভাস্কর্য দরকার। রানি ম্যাক্সিমা আমাকে গালে একটা ছোট্ট চুমুও দিয়েছেন, আশা করি আমার স্ত্রী এটা শুনবে না!’
ম্যাচ শুরুর আগে ইনস্টাগ্রামে রুমের অনুসারীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ। ম্যাচ শেষে তা একলাফে ৮ লাখ ছাড়িয়েছে। জার্মানির কাছে বিধ্বস্ত হওয়া কুরাসাও এক পয়েন্ট পাওয়ার পর ‘গ্রুপ ই’ থেকে শেষ বত্রিশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। ক্যারিবিয়ান নীল জলরাশির দেশে রুমের একটি ভাস্কর্য তো হতেই পারে।