অনলাইন ডেক্স ।।
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকায় আট বছরের শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন শিশুটির বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা। আজ মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেওয়ার সময় তিনি বলেন, ‘সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ওরফে স্বপ্না খাতুনের বাসার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাদের গোসলখানায় দেখি রক্তের ছাপ’।
সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার বাদী শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার জবানবন্দি দেওয়া শুরু হয়। অসুস্থ আবদুল হান্নান সাক্ষীর কাঠগড়ায় বসে বসে সাক্ষ্য দেন। তাঁর জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন বিচারক মাসরুর সালেকীন।
সাক্ষ্যগ্রহণের আগে অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। কাঠগড়ার সামনের দিকে একটি চেয়ারে বসেছিলেন স্বপ্না। অন্যদিকে তার স্বামী সোহেল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেটসহ কাঠগড়ার একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
জবানবন্দিতে আব্দুল হান্নান মোল্লা বলেন, প্রতিদিনের মতো গত ১৯ মে সকালে তিনি অফিসে যান। অফিসে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রী পারভীন আক্তারের ফোন পান তিনি। ফোনে পারভীন আক্তার জানান যে, তাঁর ছোট মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি অফিস থেকে আবার বাসায় ফিরে আসেন। ফিরে এসে দেখতে পান তাঁর তিনতলার ফ্ল্যাটের বিপরীত পাশের ফ্ল্যাটের সামনে মানুষের ভিড়। সেখানে তাঁর স্ত্রী পারভীন, রাজু নামের একজন, ওই ভবনের লোকজনসহ অনেকেই সোহেলদের বাসায় ডাকাডাকি করছেন। কিন্তু বাসার ভেতর থেকে কেউ দরজা খুলছেন না। পরে একটি হাতুড়ি নিয়ে আসা হয়। হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে দরজার ‘গোললক’ তালা ভেঙে ফেলা হয়। পরে দরজার ছিদ্র দিয়ে দেখেন ভেতরে একজন মহিলা হাঁটাহাঁটি করছেন। এরপর সবাই মিলে দরজা খুলে ফেলেন। এরপরই আব্দুল হান্নান, তার স্ত্রী, রাজুসহ অনেকে বাসার ভেতরে ঢোকেন।
এ পর্যায়ে সাক্ষী আব্দুল হান্নান বলেন, ‘সোহেলদের বাসার ভেতরে ঢুকে গোসলখানায় দেখতে পাই রক্তের ছাপ। তারপর ওই ফ্ল্যাটের কমনরুমের দরজা ভাঙা হয়। ওই রুমে সোহেল ও তার স্ত্রী থাকতেন।’
আব্দুল হান্নান মোল্লা তাঁর জবানবন্দিতে আরও বলেন, ‘কমনরুমের স্টিলের খাট উঁচু করে দেখতে পাই আমার মেয়ের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করা। খাটের নিচে বিচ্ছিন্ন দেহ রাখা ছিল। অন্য পাশে একটি বালতির ভেতর মাথা দেখি। এরপর আর আমি কিছু বলতে পারব না।’
জবানবন্দিতে বাদী বলেন, ‘এরপর পুলিশ আসে। পুলিশ এসে তাদের কাজ সমাধা করে। পরে আমি থানায় গিয়ে আসামি সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্ন খাতুনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করি।’
এ পর্যায়ে সাক্ষী তাঁর এজাহার ও এজাহারে তাঁর স্বাক্ষর আদালতে শনাক্ত করেন।
আব্দুল হান্নানের জবানবন্দি শেষ হওয়ার পর আসামিপক্ষের রাষ্ট্রীয় খরচে নিযুক্ত আইনজীবী মুসা কলিমুল্লাহ জেরা করেন। জেরার জবাবে আব্দুল হান্নান বলেন, তিনি অফিসে পৌঁছে খবর জানতে পারেন তার মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে না। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বাসায় ফেরার জন্য বাসে ওঠেন। ২০ থেকে ২৫ মিনিট সময় লাগে বাসায় ফিরতে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী প্রশ্ন করেন, যে কক্ষে মৃতদেহ দেখতে পান সেই কক্ষে জানালা ছিল কিনা। আব্দুল হান্নান বলেন, সেটা ঠিক জানি না। এরপর আইনজীবী বলেন, আসামি সোহেল ও তার স্ত্রী শিশুটিকে হত্যা ও ধর্ষণে জড়িত ছিলেন না। পূর্ব শত্রুতার কারণে তাদের মামলায় জড়ানো হয়েছে। আব্দুল হান্নান তখন বলেন—এটা সঠিক নয়।
আব্দুল হান্নানের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর তার স্ত্রী পারভীন আক্তার সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এই মামলা বিচারের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করতে সহযোগিতা করেন।
গতকাল সোমবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার কাজ শুরু হয়।
গত ২৪ মে বিকেলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক অহিদুজ্জামান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।
পরে মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত করে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হক ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠান। ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ করে সোমবার অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন। সোমবার অভিযোগ গঠনের পর আজ মঙ্গলবার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেন।
মামলার অভিযোগপত্রে আসামিদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (২) / ৩০ ধারা ও দণ্ডবিধির ২০১ / ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী আট বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণ পরবর্তীতে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা এবং পরবর্তীতে মরদেহ গুম করার জন্য গলা কেটে দুই ভাগ করা, যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করা ও দুই হাত কাঁধের কাছ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে তার স্বামীর এসব কাজে সহযোগিতা করার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামত সমূহের ফরেনসিক, রিপোর্ট, ডিএনএ পরীক্ষা এবং মরদেহের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন থেকে প্রমাণ হয় ওই শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
গত ১৯ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পল্লবী থানাধীন সেকশন-১১, ব্লক-বি, অ্যাভিনিউ-৭ এর ৩৭ নম্বর বাসার ৫ তলা ভবনের ৩য় তলার উত্তর পাশের কক্ষের বেডরুম থেকে ৮ বছরের শিশু পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রীর মস্তকবিহীন মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। কিছুক্ষণ পর রঙের বালতি থেকে মাথা উদ্ধার করা হয়। এ সময় স্বপ্না আক্তার দাঁড়ানো ছিলেন। তিনি জানান, তার স্বামী সোহেল রানা শিশুকে বাথরুমে আটকে ধর্ষণ করার পর মেরে ফেলে। পরে মরদেহ গায়েব করার জন্য ধারালো ছুরি দ্বারা গলা কেটে ফেলেন। কাঁধ থেকে দুই হাত বিচ্ছিন্ন করেন। এরপর শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পুলিশকে খবর দেন এবং স্বপ্না আক্তারকে আটক করেন। পরে অভিযান চালিয়ে সোহেলকে আটক করে পুলিশ।
২০ মে ভোরে আব্দুল হান্নান পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা দায়ের করেন। মামলায় উল্লেখ করা হয়, যে বাসা থেকে ওই শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় তার পাশের বাসাই বাদীর বাসা। সকাল সাড়ে ৯টায় ওই শিশু বাসা থেকে বের হলে তাকে পাশের বাসায় নিয়ে আটকে রাখে। তাকে ধর্ষণ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
উল্লেখ্য গত ২০ মে সোহেল রানা আদালতে জবানবন্দি দিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।