বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:১২ অপরাহ্ন
Logo
সর্বশেষ :

৮ বছর ধরে ঘরবন্দি সামিম, শোনান কোরআন তেলাওয়াত করে

/ ২২ বার পড়া হয়েছে
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬

বাবুগঞ্জ প্রতিনিধি ।।

মাদরাসায় দাখিল ও আলিম পর্যন্ত পড়েছিলেন সামিম হাওলাদার। ছিল স্ত্রী ও ফুটফুটে এক কন্যাসন্তান। কিন্তু হঠাৎ মানসিক অসুস্থতা কেড়ে নেয় তার স্বাভাবিক জীবন। এরপর কেটে গেছে প্রায় এক যুগ। এখন একটি ছোট্ট ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তার পৃথিবী। টিনের একটি ঘরেই কাটছে তার দিন-রাত।

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের সাড়ে পাঁচ আনী গ্রামের এই যুবকের জীবনের গল্প যেন এক দীর্ঘ অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি। একসময় পায়ে শিকল দিয়ে আটকে রাখা হতো তাকে। বর্তমানে আটকে রাখা হয় ঘরে।

ঘরটিতে স্বাভাবিকভাবে প্রবেশ ও বের হওয়ার কোনো দরজা নেই। সামনে রয়েছে লোহার গ্রিল। সেই গ্রিলের ফাঁক দিয়েই দেওয়া হয় খাবার। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই চলছে তার জীবন।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় ১২ বছর আগে হঠাৎ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন সামিম। প্রথম দিকে রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় মানুষের ওপর চড়াও হতেন। পরবর্তী সময়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে প্রথমে তার পায়ে শিকল পরিয়ে রাখেন। পরে বাড়ির পাশে ইটের দেওয়াল ও টিনের ছাউনি দিয়ে ছোট একটি ঘর তৈরি করে সেখানে রাখার ব্যবস্থা করা হয় তাকে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঘরের সামনে লোহার গ্রিলের ভেতরেই অবস্থান করছেন সামিম। কেউ ডাক দিলে গ্রিলের কাছে এসে কথা বলেন। দীর্ঘদিন ধরে বাইরে যাতায়াতের সুযোগ না থাকলেও তার কথাবার্তায় স্বাভাবিকতার কিছুটা প্রকাশ দেখা যায়। এমনকি গ্রিলের ভেতর থেকেই পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করে শোনান তিনি।

প্রতিবেশী হৃদয় বলেন, ‘সামিম ভাই একসময় এলাকার খুব ভালো মানুষ ছিলেন। হঠাৎ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর থেকেই তাকে ঘরের মধ্যে রাখা হয়েছে। কী কারণে এমন হয়েছে, তা আমরা জানি না।’

সামিমের চাচাতো ভাই বাবুল হোসেন জানান, পড়াশোনা শেষ করে সামিমের সংসার জীবনও ভালোই চলছিল। তার একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর আচরণে পরিবর্তন আসে। একপর্যায়ে তিনি পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। এমনকি মেয়েকেও দা নিয়ে ধাওয়া করেছিলেন। এ অবস্থায় পরিবারের নিরাপত্তা এবং স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে তাকে ঘরে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তার স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে অন্যত্র চলে যান।

সামিমের চিকিৎসা করাতে কম চেষ্টা করেননি তার বাবা সত্তরোর্ধ্ব কালাম হাওলাদার। ছেলের সুস্থতার আশায় বিক্রি করেছেন জমিজমা, করেছেন ধারদেনা। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি। দীর্ঘদিনের এই সংগ্রামে এখন নিজেও অসুস্থ। পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি।

কালাম হাওলাদার বলেন, ‘ছেলের চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি করেছি, মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করেছি। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েছি। কিন্তু কোনো কূলকিনারা পাইনি। এখন আমিও প্যারালাইজড। কী করব, বুঝতে পারছি না।’

এ বিষয়ে বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা উল হুসনা বলেন, ‘আলিম পাস করা একজন মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এভাবে মানসিক অসুস্থতায় ভুগে ঘরবন্দি রয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। বিষয়টি জানার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হবে। প্রাথমিকভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী দিয়ে তার পাশে থাকার চেষ্টা করা হবে।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com