:
মানুষের জ্ঞান কখনোই পূর্ণতা লাভ করে না। আমার জ্ঞানও সীমিত। সেই সীমিত জ্ঞানের আলোতেই জীবনের পথচলায় কিছু উপলব্ধি সঞ্চয় করেছি। সময়, অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব জীবনের শিক্ষা আমাকে বারবার একটি সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছে—পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ধন-সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা খ্যাতি নয়; বরং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত হলো বাবা-মা।
আজকের আধুনিক সভ্যতায় আমরা প্রযুক্তিতে উন্নত হয়েছি, শিক্ষায় এগিয়েছি, কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। কিন্তু একটি প্রশ্ন আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে জাগা উচিত—এই সাফল্যের পেছনে যাঁদের নির্ঘুম রাত, সীমাহীন ত্যাগ, অশ্রু আর দোয়া রয়েছে, তাঁদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কতটুকু পালন করছি?
শৈশবে পৃথিবীকে দেখেছি বাবা-মায়ের চোখ দিয়ে। তাঁদের হাত ধরেই প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা, প্রথম শিক্ষা গ্রহণ। আমার একটি হাসি তাঁদের মুখে এনে দিত আনন্দের আলো, আর আমার সামান্য কষ্ট তাঁদের রাতের ঘুম কেড়ে নিত। নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এমন উদাহরণ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।
জীবনের নানা ধাপ অতিক্রম করে আজ উপলব্ধি করি—আমার বাবা ছিলেন সততা, আত্মমর্যাদা ও সংগ্রামের প্রতীক। আমার মা ছিলেন আদব, নম্রতা, মমতা ও ভালোবাসার জীবন্ত বিদ্যালয়। আজ আমি যা কিছু, তার পেছনে তাঁদের সীমাহীন ত্যাগ, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং আল্লাহর দরবারে করা অসংখ্য দোয়া জড়িয়ে আছে।
কিন্তু জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে কখনো কখনো আত্মভোলা করে দেয়। সংসার, সন্তান, পেশা এবং দায়িত্বের ভিড়ে আমরা অনেকেই অজান্তেই বাবা-মায়ের জন্য সময় কমিয়ে দিই। অথচ একদিন তাঁরাই ছিলেন আমাদের পুরো পৃথিবী।
আজ নিজের সন্তানের দিকে তাকিয়ে তার না বলা কথাও বুঝতে পারি। কিন্তু কোনো দিন কি ভেবেছি—আমার বাবার সবচেয়ে প্রিয় খাবার কী ছিল? আমার মায়ের কোনো অপূর্ণ ইচ্ছা ছিল কি? তাঁদের নীরব দীর্ঘশ্বাসের ভাষা বোঝার চেষ্টা করেছি কি? তাঁদের পাশে বসে নির্ভেজাল কিছু সময় কাটিয়েছি কি?
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস এখানেই।
১৯৮৭ সালের ২৭ জানুয়ারি রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে আমার বাবা ইন্তেকাল করেন। তখন আমি এইচএসসি পাস করে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টে সিভিল মাস্টার হিসেবে কর্মরত। আমার বড় ভাই সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা ছিলেন এবং সে সময় শীতকালীন প্রশিক্ষণে ছিলেন। বাবার শেষ সময়ে যতটুকু সেবা করা উচিত ছিল, তা করার সৌভাগ্য আমার হয়নি।
এরপর ১৯৯৬ সালের ১২ এপ্রিল, আমার মায়ের পছন্দের পাত্রীকেই আমি জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করি। কিন্তু সেই বছরেরই ১৪ ডিসেম্বর, মাগরিবের নামাজে সেজদারত অবস্থায় আমার প্রিয় মা মহান রবের ডাকে সাড়া দেন। আল্লাহ তাঁকে শহীদের মর্যাদা দান করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন—আমীন।
মায়ের জীবনের শেষ কয়েক মাস প্রতিরাতে তাঁর পাশে ঘুমানোর সৌভাগ্য হয়েছিল। প্রতিটি রাত যেন ছিল এক একটি নীরব পাঠশালা। গল্পের ছলে তিনি যে শিক্ষা দিয়েছেন, আজ জীবনের প্রতিটি বাঁকে তার গভীরতা উপলব্ধি করি। তখন বুঝিনি, তিনি যেন বিদায়ের আগে সন্তানের হৃদয়ে জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাগুলো লিখে দিয়ে যাচ্ছিলেন।
আজও হৃদয়ের গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে—যদি আর একবার বাবার হাত ধরে বলতে পারতাম, “বাবা, আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি।” যদি আর একবার মায়ের কোলে মাথা রেখে বলতে পারতাম, “মা, তোমার ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারিনি।” কিন্তু পৃথিবীর কোনো শক্তিই চলে যাওয়া বাবা-মাকে ফিরিয়ে আনতে পারে না।
এই বাস্তবতা শুধু আমার নয়; অসংখ্য সন্তানের জীবনেরও একই গল্প। তাই আজকের এই লেখা শুধু স্মৃতিচারণ নয়, বরং জীবিত বাবা-মাকে নিয়ে আমাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি বিনীত প্রচেষ্টা।
ইসলাম বাবা-মায়ের মর্যাদাকে এমন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা অন্য কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
“তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচরণ করবে। তাঁদের একজন বা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাঁদের প্রতি ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না, ধমক দিও না; বরং তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।”
— (সুরা আল-ইসরা: ২৩)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন—
“আমার প্রতি এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। আমারই কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন।”
— (সুরা লুকমান: ১৪)
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।”
— (জামে তিরমিজি)
আরেক হাদিসে তিনি বলেছেন—
“জান্নাত মায়ের পদতলে।”
— (নাসাঈ)
আজ সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু পারিবারিক মমতা কমছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা হাজার মানুষের খোঁজ রাখি, অথচ নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে কয়েক মিনিট বসে কথা বলার সময় পাই না। এটি শুধু সামাজিক সংকট নয়; একজন মুমিনের জন্য আত্মসমালোচনার বিষয়।
মনে রাখতে হবে, সন্তান আমাদের মুখের উপদেশের চেয়ে আমাদের জীবন থেকেই বেশি শিক্ষা গ্রহণ করে। আমরা যদি বাবা-মায়ের সেবাকে ইবাদত মনে করি, তাঁদের সম্মান করি, তাঁদের পাশে দাঁড়াই, তবে আমাদের সন্তানরাও একদিন সেই শিক্ষাই অনুসরণ করবে। আর যদি অবহেলা করি, সেই অবহেলার প্রতিধ্বনি ভবিষ্যতে আমাদের জীবনেও ফিরে আসতে পারে।
তাই আসুন, আজই আমরা একটি দৃঢ় অঙ্গীকার করি—যাঁদের বাবা-মা জীবিত আছেন, তাঁরা তাঁদের সেবাকে জীবনের সর্বোচ্চ ইবাদতগুলোর একটি মনে করবেন। তাঁদের সঙ্গে সময় কাটাবেন, তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন, তাঁদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করবেন এবং তাঁদের দোয়া অর্জন করবেন।
আর যাঁদের বাবা-মা ইন্তেকাল করেছেন, তাঁরা তাঁদের জন্য নিয়মিত দোয়া করবেন, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছে দেবেন, সদকায়ে জারিয়া করবেন এবং এমন নেক আমল করবেন, যার সওয়াব তাঁদের আমলনামায় পৌঁছায়।
কারণ পৃথিবীতে বাবা-মায়ের কোনো বিকল্প নেই। তাঁদের সন্তুষ্টির মধ্যেই রয়েছে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি, আর তাঁদের প্রতি উত্তম আচরণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দুনিয়ার বরকত ও আখিরাতের সফলতার চাবিকাঠি।
হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যে পরিপূর্ণ করে দিন। জীবিত অবস্থায় তাঁদের যথাযথ সেবা করার তাওফিক দান করুন। যাঁরা ইন্তেকাল করেছেন, তাঁদের সকল গুনাহ মাফ করে দিন, তাঁদের কবরকে জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান বানিয়ে দিন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন।
আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।