মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০০ পূর্বাহ্ন
Logo

নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুল: অসাধু জেলের জালে মা ইলিশ

/ ২৮ বার পড়া হয়েছে
আপডেট : সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬

পটুয়াখালী প্রতিনিধি ।।

নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে নদী ও সাগরে ইলিশ শিকারে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। তবে সরকারের এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও থেমে নেই মা ইলিশ শিকার। মৎস্য অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে জাল জব্দ, কারাদণ্ড ও জরিমানার পরও অসাধু জেলেদের দৌরাত্ম্য থামেনি। মাদারীপুরের শিবচর ও রাজবাড়ীতে পদ্মা নদীতে প্রতিদিন অবৈধভাবে ইলিশ শিকার করে প্রকাশ্যে বিক্রি করছেন জেলেরা। এই দৃশ্য দেখা গেছে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীতে।

৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেয় মৎস্য অধিদপ্তর। এই সময়ে ইলিশ শিকার, পরিবহন, সংরক্ষণ, বাজারজাত ও ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। গতকাল রোববার নিষেধাজ্ঞার ১১ দিন শেষ হয়েছে।

পদ্মাপাড়েই ইলিশ বিক্রি
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বন্দরখোলা ইউনিয়নের কাজিরসূরা এবং চরজানাজাত ইউনিয়নের হীরাখার বাজারসংলগ্ন পদ্মার পাড়ে প্রতিদিন দেদার বিক্রি হচ্ছে মা ইলিশ। এসব ইলিশ পদ্মা থেকে ধরে নৌকায় করে তীরে আনা হয়। পেটে ডিমভর্তি ইলিশ কিনতে প্রতিদিন সকাল এবং বিকেলে পদ্মার চরাঞ্চলে ছুটে যাচ্ছেন শত শত ক্রেতা।

গত শনিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্দরখোলা ইউনিয়নের শেষ প্রান্তে পদ্মাপাড়ের কাজিরসূরা বাজারের পাশেই বসেছে ইলিশের অস্থায়ী হাট। নদীর পাড়ে একের পর এক ট্রলার এসে ভিড়ছে। ট্রলারে বসেই ইলিশ বিক্রি করছেন জেলেরা। অবৈধভাবে শিকার করার কারণে তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম দামে বিক্রি করা হয় এসব ইলিশ। ফলে ক্রেতাদের ভিড় দেখা যায় এখানে।

কাজিরসূরা এলাকার বাসিন্দারা বলেন, ‘রাতে ধরা ইলিশ ভোর থেকে বিক্রি শুরু হয়। ফজরের আজানের পরপরই মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। সকাল ৮-৯টার মধ্যে সকালের হাট ভেঙে যায়। এরপর দিনে যে মাছ ধরা হয়, তা নিয়ে আসরের পর বেচাকেনা শুরু হয়। চলে রাত ৮-৯টা পর্যন্ত। এ ছাড়া পদ্মা নদীর বিভিন্ন চর এলাকায় রাতেও মাছ পাওয়া যায়।’

এ সময় ইলিশ কিনতে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে আসা সুলতানা বেগম নামের এক প্রবাসীর স্ত্রী বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে এই সময় পদ্মার তাজা ইলিশ পাওয়া যায়। এগুলো বরফ দেওয়া থাকে না। এ জন্যই কিনতে আসি।’

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা একাধিক জেলে নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানান, এই সময়ে নতুন জেলেদেরও আগমন ঘটে। পদ্মার বিভিন্ন এলাকা থেকে মাছ ধরা হয়। বিশেষ করে মধ্যরাতে ফেলা জালে মাছ বেশি ধরা পড়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাবাজার-চরজানাজাত সীমান্ত এলাকা, হীরাখার বাজারসংলগ্ন নদীর পাড়সহ পদ্মার চর এলাকার চার-পাঁচটি স্থানে ইলিশের অবৈধ হাট বসে।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, ‘মা ইলিশ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান চলছে। পদ্মার তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ অস্থায়ী হাটগুলো বন্ধ করতে শিগগির বড় ধরনের সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

একই চিত্র দেখা গেছে রাজবাড়ীতে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় পদ্মায় অবাধে চলছে ইলিশ শিকার। দিনের আলোতেই নদীর পাড়ে বসছে ইলিশ বিক্রির হাট।

রাজবাড়ী সদরের উড়াকান্দা, গোদারবাজার ও মেছোঘাটা এবং গোয়ালন্দ উপজেলার অন্তার মোড়, কুশাহাটা ও কলারবাগান এলাকায় ইলিশ ধরা ও বিক্রি দেখা যাচ্ছে।

সদর উপজেলার জেলে বাবু বলেন, ‘প্রকৃত জেলেরা সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে মাছ শিকার করছেন না। তবে মৌসুমি জেলেরা এ সময় অবাধে মাছ শিকার করছেন। এতে প্রকৃত জেলেদের পাশাপাশি মা ইলিশ সংরক্ষণের উদ্যোগও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

রাজবাড়ী সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ার ইসলাম পাইলট বলেন, ‘জনবলসংকট ও পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে অভিযান পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গত বছর অভিযানে কোস্ট গার্ডের সহযোগিতা পাওয়া গেলেও এ বছর তা পাওয়া যাচ্ছে না।’

রাজবাড়ীর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক বলেন, ‘আমরা সাধ্যমতো নদীতে গিয়ে অভিযান পরিচালনা করছি। এর মধ্যেও লোকচক্ষুর আড়ালে অসাধু মৌসুমি জেলেরা মাছ শিকার করছেন।’

তেঁতুলিয়ায় নজরদারি কম
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীতে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অবাধে মা ইলিশ শিকার চলছে। নদীর বিভিন্ন স্থানে ট্রলার নিয়ে জেলেদের মাছ ধরতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের পর দিন প্রকাশ্যে মাছ শিকার চললেও সব এলাকায় প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি নেই।

গত শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে তেঁতুলিয়া নদীর চরব্যারেট এলাকায় বহু নৌকায় জেলেদের মাছ শিকার করতে দেখা যায়। সকাল থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত চলে এই জাল তোলাফেলা। পরে মাছ নিয়ে নির্বিঘ্নে ঘাটে ফিরে যান জেলেরা। এ ছাড়া ধুলিয়া লঞ্চঘাট থেকে বগী-তুলাতলা এবং দক্ষিণ চরওয়াড়েল থেকে চর রায়সাহেব পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় ট্রলার নিয়ে মাছ শিকারে নামছেন জেলেরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, চরব্যারেট এলাকায় স্থানীয় যুবদল নেতা মো. আব্বাস ফরাজীর ছত্রচ্ছায়ায় জেলেরা ট্রলার নিয়ে মাছ শিকার করছেন। সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মাছ ধরার বিষয়ে তাঁর কাছে ফোনে জানতে চাইলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।

বাউফলের ইউএনও সালেহ আহমেদ বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পূজার নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে অভিযান জোরদার করা হবে।’

বাউফল উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা এম এম পারভেজ বলেন, ‘আমরা নদীতে অভিযান অব্যাহত রেখেছি। তবে বিশাল নদীর সব এলাকায় সব সময় নজরদারি করা সম্ভব হয় না।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com