অনলাইন ডেক্স ।।
দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানির ঘাটতি কমাতে প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। মিয়ানমার বাংলাদেশে গ্যাস রপ্তানির বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। দেশটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির প্রস্তাব দিয়েছে। উভয় প্রস্তাবের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখতে শিগগির দুই দেশের মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ঢাকায় আজ রোববার মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা-বিষয়ক আলোচনায় প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়। মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলে থাকা ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মোয়ে বাংলাদেশে গ্যাস রপ্তানির বিষয়ে তাঁর দেশের ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব জানা গেছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় মিয়ানমার প্রতিনিধিদলে রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মোয়ে ছাড়াও কমার্শিয়াল কাউন্সিলর মিয়াত লউইন উপস্থিত ছিলেন। মিয়ানমার প্রতিনিধি-দলের সঙ্গে এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানিসচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, বিদ্যুৎসচিব মিরানা মাহরুখ।
সূত্র জানায়, বৈঠকে মিয়ানমার প্রতিনিধিদলকে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের বেশ চাহিদা রয়েছে। চাহিদা পূরণে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি সংগ্রহের বিষয়ে বাংলাদেশের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকের জন্য মিয়ানমারকে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
বৈঠকে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব দিলে বিপরীতে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এলএনজি রপ্তানির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
উভয় প্রস্তাবের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখতে শিগগির মন্ত্রিপর্যায়ের একটি বৈঠকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়। মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত বৈঠকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠক করে এ বিষয়ে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
প্রতিবেশী মিয়ানমার গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ হলেও বাংলাদেশ তার চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দূরের দেশ থেকে আমদানি করে। আমদানির পরও দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদার এক-চতুর্থাংশ ঘাটতি থেকে যায়। জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, দেশে দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছিল ২৭০-২৮০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে বঙ্গোপসাগরে ভাসমান দুটি এলএনজি টার্মিনাল হয়ে আমদানি করা ৮০ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসও রয়েছে। সম্প্রতি একটি এলএনজি টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডের পর বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস-সংকট চলছে। ফলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, গাড়ি, বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন গ্যাস নিতে সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছে। বাসাবাড়িতে দিনের বেশির ভাগ সময় পাইপলাইনের গ্যাসের চুলা না জ্বলায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে মানুষ।
গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে মালয়েশিয়ার সঙ্গেও আলোচনা শুরু করেছে। মালয়েশিয়া থেকে ছোট কার্গো জাহাজে এলএনজি এনে তা দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের মাধ্যমে অধিক সমস্যাপ্রবণ শিল্পাঞ্চলে সরবরাহের চিন্তা চলছে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে জ্বালানিমন্ত্রী সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেছেন, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে উভয় দেশের মধ্যে পাইপলাইন স্থাপিত হলে তা সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
সংঘাত ও গৃহযুদ্ধ চলা মিয়ানমার এশিয়ার অন্যতম প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ। দেশটি বর্তমানে থাইল্যান্ড ও চীনে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের গ্যাস রপ্তানি করে। মিয়ানমারের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে তৈরি পোশাকের পরই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিজনেস টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সাগরে এ পর্যন্ত চারটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে সাগরের তলদেশ হয়ে থাইল্যান্ডে গ্যাস রপ্তানি হয়। বাংলাদেশসংলগ্ন রাখাইন রাজ্যের পাশে বঙ্গোপসাগরে আবিষ্কৃত একটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে স্থলপথে চীনে গ্যাস রপ্তানি হয়।